বিজ্ঞান ভাবনা (২০৩): না শান্তি না যুদ্ধ
ইস্তানবুলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শেষ হল। এর নীট রেজাল্ট মনে হয় পরস্পরের সাথে আলোচনার পথ খুলে রাখা আর বন্দী ও লাশ বিনিময়। কিন্তু প্রথম আলোচনার পর থেকে এমন কিছু ঘটেনি যা শান্তি চুক্তিকে কিছুটা হলেও এগিয়ে আনতে পারে। উল্টো দু’ পক্ষ থেকেই ব্যাপক আক্রমণ হয়েছে। যুদ্ধের মাঠে ইউক্রেন কোণঠাসা হলেও এ দেশের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার চেষ্টা করছে, সফল হচ্ছে। এটা তাদের শান্তি চুক্তিতে সই করার আগে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকুলে নিয়ে আসার জন্য মরণ কামড়। অন্যদিকে রাশিয়াও যুদ্ধ ক্ষেত্রে ইউক্রেনকে চেপে ধরছে, একের পর এক নতুন জায়গা দখল করছে। চাইছে দনবাস সহ চারটি অঞ্চলের যে অংশ এখনও ইউক্রেনের দখলে আছে তা মুক্ত করতে আর ইউক্রেন যাতে রাশিয়া আক্রমণ করতে না পারে ইউক্রেনের ভেতরে বাফার জোন তৈরি করতে। এই লক্ষ্য থেকেই সুমা, খারকভ এসব এলাকায় ঢুকে পড়েছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। ফলে শেষ পর্যন্ত কোন ধরণের চুক্তি হবার সম্ভাবনা দিন দিন কমে আসছে।
এর আগে ইউক্রেন বার বার যুদ্ধ বিরতিকে নিজেদের কাজে লাগিয়েছে। এবারও বসে থাকেনি। বিভিন্ন ভাবে এদের ব্যস্ত রেখে ঠিক আক্রমণ করেছে বিভিন্ন বিমান ঘাঁটিতে। বেশ কিছু স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমান ধ্বংস করেছে। সঠিক সংখ্যা মনে হয় কোন দিনই জানা যাবে না। ইউক্রেন থেকে বলছে মোট ৪১ টি বিমানে আঘাত হেনেছে, তবে ধ্বংস করেছে ১২ বিমান যার মধ্যে টু-৯৫ ও টু-২২এম৩ ছিল। জেলেনস্কির ভাষ্যে তারা রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমানের ৩৪% ধ্বংস করেছে। তবে রাশিয়ার সোর্স বলছে এই হামলায় দশটির কম বিমান নষ্ট হয়েছে, তবে এখনও যা আছে তা দিয়ে ইউক্রেনকে শিক্ষা দেয়া কোন সমস্যা নয়। এখানকার বিভিন্ন ইন্ডিপেন্ডেন্ট সোর্স জানাচ্ছে ৫ টি টু-৯৫ ও ২ টি টু-২২এম৩ এবং ১ টি আন ১২ বিমানের কথা। টাকার অংকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। তবে এটা শুধু টাকার ব্যাপার নয়, প্রেস্টিজের ব্যাপার। এই ড্রোনগুলো ইউক্রেন থেকে উড়ে আসেনি। কার্গো ট্রাকে করে মুরমানস্ক, ইরকুতস্ক এসব এলাকায় নেয়া হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে স্থানীয় কোলাবরেটরদের সহায়তায়। ট্রাক ড্রাইভার ধরা পড়েছে। সে বলেছে সে জানত না কি আনছে। এটা ঠিক যে এই আক্রমণ দীর্ঘদিন ধরে সাজানো হয়েছে, অনেক লোকজন এতে অংশ নিয়েছে, অনেকেই সাহায্য করে কিছু না জেনে আবার জেনেশুনেও করেছে অনেকেই। রাশিয়ার মত বিশাল দেশে যেখানে শত শত কিলোমিটার বন আর বন, সেখানে ড্রোন এসেম্বল করা কঠিন কিছু নয়। ইদানীং কালে প্রায়ই বিভিন্ন শহরে ড্রোন আক্রমণ হচ্ছে। মাত্র গত সপ্তাহে দুবনায় ১৫ টি ড্রোন আক্রমণ করে। অনেকের ধারণা সব ড্রোন ইউক্রেন থেকে আসে না, এখানে তাদের দোসররা ভীষণ রকম সক্রিয়। এত দিন পর্যন্ত এটা শুধু ধারণা ছিল, কিন্তু ইরকুতস্ক ও মুরমানস্কে হাতেনাতে ধরা পড়ায় বলা যায় এদের এখন প্রচণ্ড রকম সতর্ক হতে হবে দেশের ভেতরের শত্রুর বিরুদ্ধে। হয়তো আইনেও কিছু পরিবর্তন হতে পারে। তবে এসব পরের ব্যাপার। এখন কি শান্তি চুক্তি হবে?
মনে রাখা দরকার যে যদিও পশ্চিমা বিশ্ব বার বার রাশিয়াকে দোষারোপ করছে যুদ্ধ লাগানোর জন্য, তারাই সব কিছু করেছে যাতে রাশিয়া যুদ্ধে নামে। তাদের ধারণা ছিল, যুদ্ধ শুরু হলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়ার অর্থনীতি ধ্বংস করে এখানে পুতিন বিরোধী জনমত গড়ে তুলবে আর ইয়েলৎসিনের মত কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাশিয়াকে তাঁবেদার রাষ্ট্র বানাবে। সেই মধ্যজুগ থেকেই রাশিয়া ছিল পশ্চিমাদের চোখের শূল। পিটার দ্য গ্রেটের আগে পর্যন্ত রাশিয়া অবশ্য ব্যস্ত ছিল পূর্বাঞ্চলে তাতার মঙ্গোলদের আক্রমণ ঠেকাতে। পিটার দ্য গ্রেট ইউরোপের জানালা খুলেন সপ্তদশ শতকে। প্রথমে তিনি সুইডেনের রাজার কাছে পিটারবার্গের জন্য সামান্য ভূখণ্ড চেয়েছিলেন। সুইডেন রাজী না হয়ে যুদ্ধ শুরু করে, ফলে পিটারবার্গ সহ কারেলিয়া, ফিনল্যান্ড এসব হারায়। এর আগে অবশ্য পোল্যান্ড রাশিয়া দখলের চেষ্টা করে, কয়েক বছর মস্কো পোলিশ রাজ্যের অধীনে থাকে। ১৬১২ সালে শুরু হয় পোল্যান্ডকে বিতাড়িত করার যুদ্ধ কুজমা মিনিন আর পঝারস্কির নেতৃত্বে। প্রায় ৮০০ বছরের রিউরিখ ডাইনাস্টির পরে ১৬১৩ সালে ক্ষমতায় আসে রোমানভ ডাইনাস্টি। এরপর ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন ইউরোপ দখল করে রাশিয়া দখল করতে আসেন। হিটলার ১৯৪১ সালে ইউরোপ দখল করার পড়ে রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। সেই অর্থে সম্মিলিত ইউরোপ বার বার রাশিয়া আক্রমণ করেছে এ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের জন্য। ম্যাডলিন অলব্রাইট সহ অনেকেই প্রকাশ্যে রাশিয়া ভেঙে কয়েকটি দেশ গড়ার কথা বলেছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লোলো ডি সিলভার ভাষায় বাইডেন তাঁকে রাশিয়া ধ্বংসের কথা বলেছেন। আর ইউরোপকে টোপ দিয়েছেন সবাই মিলে রাশিয়া দখল করতে। যদিও ইউরোপ যথেষ্ট কম দামে রাশিয়ার কাঁচামাল পেত, তারা আমেরিকার প্রস্তাবে রাজি হয়। ধারণা ছিল তাহলে বিনামূল্যে সব পাওয়া যাবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে ইউরোপ কাঁচামালের জন্য সব সময়ই বিভিন্ন কলোনির উপর নির্ভরশীল। অনেকের ধারণা তাদের লক্ষ্য ছিল বর্তমান ইউরোপের সাথে ইউক্রেন, বেলারুশ, জর্জিয়া এসব নিয়ে সম্মিলিত ইউরোপ গঠন করে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সেই হিসেব ভুল হওয়ায় ইউরোপ পড়েছে বিপদে। তারা এই যুদ্ধে প্রচুর ইনভেস্ট করেছে আর তাই শেষ দেখতে চায়। তাদের বিশ্বাস রাশিয়া কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। অন্যদিকে আমেরিকাও চায় না রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে। প্রশ্ন হল যুদ্ধে পরাজয়ের দ্বারে পৌঁছেও ইউক্রেন কেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক এয়ারপোর্টে আক্রমণ চালাল? এর আগে ইউক্রেন অনেক বার এরকম প্রভোকেটিভ আক্রমণ চালিয়েছে, রাশিয়া উত্তর দিয়েছে আর সেটাকে পুঁজি করে ইউক্রেন ও তার ইউরোপিয়ান দোসররা রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে সক্ষম হয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেসব পালটে গেছে। ফলে এমনকি গতকাল ট্রাম্প ও পুতিনের মাঝে ফোনালাপে ট্রাম্প কোন পক্ষ নেননি, বরং কিয়েভে আমেরিকার নাগরিকদের সাবধানে চলাফেরা করতে বলেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ইউক্রেন চেষ্টা করেছিল যেকোনো উপায়েই হোক আলোচনা থেকে বেরিয়ে যেতে, রাশিয়া সেটা করেনি, বরং ৬ হাজার মৃতদেহ হস্তান্তর করে কিয়েভকে বিপদে ফেলেছে। কেননা এত দিন যদি এই সেনাদের নিখোঁজ হিসেবে দেখানো হত, এখন সেটা করা তো যাবেই না, বরং তাদের পরিবারবর্গকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই আক্রমণের মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে ব্রিয়ানস্ক ও কুরস্ক প্রদেশে দুটো বেসামরিক ট্রেনে আঘাত হেনে কিয়েভ নিজেকে সন্ত্রাসবাদী রেজিম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই প্রথমবারের মত পুতিন কিয়েভের ক্ষমতাসীনদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হয়তো পরবর্তীতে সেভাবেই তাদের ট্রিট করা হবে।
এখন আসা যাক মেমোরেন্ডামের কথায়। রাশিয়ায় পক্ষ থেকে দেয়া সেই মেমোরেন্ডামে নিম্ন দাবীগুলো উল্লেখ করা হয়েছে – ১) রাশিয়ার অংশ হিসেবে ক্রিমিয়া, লুগানস্ক, দানিয়েৎস্ক, হেরসন ও জাপারঝিয়াকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দান ও সেখান থেকে ইউক্রেনের সমস্ত সৈন্য ও আরটিলারি অপসারণ; ২) ইউক্রেনের নিরপেক্ষ স্ট্যাটাস, যেকোনো ধরণের সামরিক ব্লকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা ও নিজ দেশে তৃতীয় কোন দেশের সামরিক ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা করতে না দেয়া; ৩) ইতিমধ্যে কোন ধরণের সামরিক চুক্তি থেকে থাকলে সেটা রহিত করা ও নতুন চুক্তি না করা; ৪) ইউক্রেন ভূখণ্ডে যেকোনো ধরণের পারমাণবিক অস্ত্র গ্রহণ, পরিবহন বা স্থাপনের উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ; ৫) ইউক্রেনে সেনাসদস্য ও সমরাস্ত্রের সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর অধীনে গঠিত ফ্যাসীবাদী সামরিক কাঠামো (যেমন আজভ) বিলোপ; ৬) রুশ ভাষাভাষী ইউক্রেন নাগরিকদের নাগরিক অধিকার পরিপূর্ণ ভাবে নিশ্চিত করা, রুশ ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দান; ৭) ফ্যাসিবাদের প্রোপ্যাগান্ডা এবং ফ্যাসিস্ট নেতাদের বীর হিসেবে মর্যাদা দেবার উপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সমস্ত রকমের ফ্যাসিবাদী সংগঠন ও রাজনৈতিক দল বিলোপ করা; ৮) বর্তমানে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সক্রিয় বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া ও নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা; ৯) যুদ্ধ কালীন সময়ে যেসব পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে তাদের একত্রিত করার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা; ১০) যুদ্ধের সময় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে পারস্পরিক দাবি মওকুফ; ১১) রুশ অর্থোডক্স চার্চের উপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া; ১২) স্টেপ বাই স্টেপ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করা। এছাড়াও যুদ্ধ বিরতির ব্যাপারে ১০ টি ও সেগুলো বাস্তবায়িত করার টাইম ফ্রেম নিয়ে আরও ৯ টি দাবি উল্লেখ করা হয়েছে মেমোরেন্ডামে। পশ্চিমা বিশ্ব এ নিয়ে মতামত দিতে শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক শুরু হয়েছে টেরিটরি নিয়ে, বিশেষ করে নতুন চার প্রদেশের সেসব অঞ্চল যা এখনও ইউক্রেন সেনাদের দখলে। অন্য একটি বিতর্কিত বিষয় হল ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এবং তার নিরপেক্ষ স্ট্যাটাস। এখনও সেখানে ফ্যাসিস্ট দলগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী। চাইলেই তাদের নাই করে দেয়া যাবে না। আইনত ভাবে নিষিদ্ধ হলেও আন্ডারগ্রাউন্ডে তারা কাজ করতেই পারে, যা এতদিন করেছে। প্রশ্ন উঠবে রুশ ভাষা ও চার্চ নিয়ে। আসলে দেশ সেই ১৯৯১ সাল থেকেই দুই ভাগে বিভক্ত। রাশিয়ার আক্রমণের পরে রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকেই হয়তো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, কিন্তু নেতৃত্বের অদক্ষতা, করাপশন, জোর করে সবাইকে যুদ্ধে পাঠানো – ইত্যাদি প্রথম দিকের রুশ বিরোধিতা কিছুটা হলেও কমিয়ে এনেছে। আর এ কারণেই সেখানে আজ পর্যন্ত কোন ধরণের গেরিলা বাহিনী গড়ে ওঠেনি, সাধারণ মানুষ রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি যেটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। সমস্যা মানুষের নয়, সমস্যা নেতৃত্বে, নেতাদের লোভ লালসায়। দেশ বা মানুষ তাদের কাছে অর্থ উপার্জনের পণ্য। সেখানে জড়ো হয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার নিওলিবারেল গোষ্ঠী, যাদের কাছে মানুষ আসলে মানুষ নয়, তাদের আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার সৈনিক যাদের অনায়াসে এসব আদর্শের যূপকাষ্ঠে বলি দেয়া যায়। আজ ইউরোপে যে যুদ্ধের দামামা সেটা সেই একই কারণে। ২০৩০ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। যদি এর আগে সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে না পারে তাহলে মানব সভ্যতাকে ইমাম মেহেদী বা কল্কি অবতারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। তাদের ইউরোপিয়ান গুরুরাই দক্ষতার সাথে মানব সভ্যতা ধ্বংস করতে সক্ষম। সেটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। কয়েক লাখ বছর পরে হয়তো নতুন কোন প্রাণী নিজদের মধ্যে তর্ক করবে কীভাবে মানুষ নামক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল পৃথিবীর বুক থেকে ঠিক এখন যেমন আমরা করি ডাইনোসারদের নিয়ে। পৃথিবী সর্বংসহা। এক প্রজাতি যাবে, আরেক প্রজাতি আসবে। পৃথিবী ঠিকই নতুন কাউকে সুযোগ দেবে তাকে নতুন করে সাজাতে। মূষিক আবার সিংহ হবে, পৃথিবী ধ্বংস করতে চাইবে আর মুনির অভিশাপে আবার মূষিকে রূপান্তরিত হবে। এভাবে চলবে যতদিন সূর্য তাকে আলো আর তাপ দেবে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৬ জুন ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
https://www.progotirjatree.com/2025/06/06/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a7%a8%e0%a7%a6%e0%a7%a9-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d/
এর আগে ইউক্রেন বার বার যুদ্ধ বিরতিকে নিজেদের কাজে লাগিয়েছে। এবারও বসে থাকেনি। বিভিন্ন ভাবে এদের ব্যস্ত রেখে ঠিক আক্রমণ করেছে বিভিন্ন বিমান ঘাঁটিতে। বেশ কিছু স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমান ধ্বংস করেছে। সঠিক সংখ্যা মনে হয় কোন দিনই জানা যাবে না। ইউক্রেন থেকে বলছে মোট ৪১ টি বিমানে আঘাত হেনেছে, তবে ধ্বংস করেছে ১২ বিমান যার মধ্যে টু-৯৫ ও টু-২২এম৩ ছিল। জেলেনস্কির ভাষ্যে তারা রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমানের ৩৪% ধ্বংস করেছে। তবে রাশিয়ার সোর্স বলছে এই হামলায় দশটির কম বিমান নষ্ট হয়েছে, তবে এখনও যা আছে তা দিয়ে ইউক্রেনকে শিক্ষা দেয়া কোন সমস্যা নয়। এখানকার বিভিন্ন ইন্ডিপেন্ডেন্ট সোর্স জানাচ্ছে ৫ টি টু-৯৫ ও ২ টি টু-২২এম৩ এবং ১ টি আন ১২ বিমানের কথা। টাকার অংকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। তবে এটা শুধু টাকার ব্যাপার নয়, প্রেস্টিজের ব্যাপার। এই ড্রোনগুলো ইউক্রেন থেকে উড়ে আসেনি। কার্গো ট্রাকে করে মুরমানস্ক, ইরকুতস্ক এসব এলাকায় নেয়া হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে স্থানীয় কোলাবরেটরদের সহায়তায়। ট্রাক ড্রাইভার ধরা পড়েছে। সে বলেছে সে জানত না কি আনছে। এটা ঠিক যে এই আক্রমণ দীর্ঘদিন ধরে সাজানো হয়েছে, অনেক লোকজন এতে অংশ নিয়েছে, অনেকেই সাহায্য করে কিছু না জেনে আবার জেনেশুনেও করেছে অনেকেই। রাশিয়ার মত বিশাল দেশে যেখানে শত শত কিলোমিটার বন আর বন, সেখানে ড্রোন এসেম্বল করা কঠিন কিছু নয়। ইদানীং কালে প্রায়ই বিভিন্ন শহরে ড্রোন আক্রমণ হচ্ছে। মাত্র গত সপ্তাহে দুবনায় ১৫ টি ড্রোন আক্রমণ করে। অনেকের ধারণা সব ড্রোন ইউক্রেন থেকে আসে না, এখানে তাদের দোসররা ভীষণ রকম সক্রিয়। এত দিন পর্যন্ত এটা শুধু ধারণা ছিল, কিন্তু ইরকুতস্ক ও মুরমানস্কে হাতেনাতে ধরা পড়ায় বলা যায় এদের এখন প্রচণ্ড রকম সতর্ক হতে হবে দেশের ভেতরের শত্রুর বিরুদ্ধে। হয়তো আইনেও কিছু পরিবর্তন হতে পারে। তবে এসব পরের ব্যাপার। এখন কি শান্তি চুক্তি হবে?
মনে রাখা দরকার যে যদিও পশ্চিমা বিশ্ব বার বার রাশিয়াকে দোষারোপ করছে যুদ্ধ লাগানোর জন্য, তারাই সব কিছু করেছে যাতে রাশিয়া যুদ্ধে নামে। তাদের ধারণা ছিল, যুদ্ধ শুরু হলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়ার অর্থনীতি ধ্বংস করে এখানে পুতিন বিরোধী জনমত গড়ে তুলবে আর ইয়েলৎসিনের মত কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাশিয়াকে তাঁবেদার রাষ্ট্র বানাবে। সেই মধ্যজুগ থেকেই রাশিয়া ছিল পশ্চিমাদের চোখের শূল। পিটার দ্য গ্রেটের আগে পর্যন্ত রাশিয়া অবশ্য ব্যস্ত ছিল পূর্বাঞ্চলে তাতার মঙ্গোলদের আক্রমণ ঠেকাতে। পিটার দ্য গ্রেট ইউরোপের জানালা খুলেন সপ্তদশ শতকে। প্রথমে তিনি সুইডেনের রাজার কাছে পিটারবার্গের জন্য সামান্য ভূখণ্ড চেয়েছিলেন। সুইডেন রাজী না হয়ে যুদ্ধ শুরু করে, ফলে পিটারবার্গ সহ কারেলিয়া, ফিনল্যান্ড এসব হারায়। এর আগে অবশ্য পোল্যান্ড রাশিয়া দখলের চেষ্টা করে, কয়েক বছর মস্কো পোলিশ রাজ্যের অধীনে থাকে। ১৬১২ সালে শুরু হয় পোল্যান্ডকে বিতাড়িত করার যুদ্ধ কুজমা মিনিন আর পঝারস্কির নেতৃত্বে। প্রায় ৮০০ বছরের রিউরিখ ডাইনাস্টির পরে ১৬১৩ সালে ক্ষমতায় আসে রোমানভ ডাইনাস্টি। এরপর ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন ইউরোপ দখল করে রাশিয়া দখল করতে আসেন। হিটলার ১৯৪১ সালে ইউরোপ দখল করার পড়ে রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। সেই অর্থে সম্মিলিত ইউরোপ বার বার রাশিয়া আক্রমণ করেছে এ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের জন্য। ম্যাডলিন অলব্রাইট সহ অনেকেই প্রকাশ্যে রাশিয়া ভেঙে কয়েকটি দেশ গড়ার কথা বলেছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লোলো ডি সিলভার ভাষায় বাইডেন তাঁকে রাশিয়া ধ্বংসের কথা বলেছেন। আর ইউরোপকে টোপ দিয়েছেন সবাই মিলে রাশিয়া দখল করতে। যদিও ইউরোপ যথেষ্ট কম দামে রাশিয়ার কাঁচামাল পেত, তারা আমেরিকার প্রস্তাবে রাজি হয়। ধারণা ছিল তাহলে বিনামূল্যে সব পাওয়া যাবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে ইউরোপ কাঁচামালের জন্য সব সময়ই বিভিন্ন কলোনির উপর নির্ভরশীল। অনেকের ধারণা তাদের লক্ষ্য ছিল বর্তমান ইউরোপের সাথে ইউক্রেন, বেলারুশ, জর্জিয়া এসব নিয়ে সম্মিলিত ইউরোপ গঠন করে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সেই হিসেব ভুল হওয়ায় ইউরোপ পড়েছে বিপদে। তারা এই যুদ্ধে প্রচুর ইনভেস্ট করেছে আর তাই শেষ দেখতে চায়। তাদের বিশ্বাস রাশিয়া কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। অন্যদিকে আমেরিকাও চায় না রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে। প্রশ্ন হল যুদ্ধে পরাজয়ের দ্বারে পৌঁছেও ইউক্রেন কেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক এয়ারপোর্টে আক্রমণ চালাল? এর আগে ইউক্রেন অনেক বার এরকম প্রভোকেটিভ আক্রমণ চালিয়েছে, রাশিয়া উত্তর দিয়েছে আর সেটাকে পুঁজি করে ইউক্রেন ও তার ইউরোপিয়ান দোসররা রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে সক্ষম হয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেসব পালটে গেছে। ফলে এমনকি গতকাল ট্রাম্প ও পুতিনের মাঝে ফোনালাপে ট্রাম্প কোন পক্ষ নেননি, বরং কিয়েভে আমেরিকার নাগরিকদের সাবধানে চলাফেরা করতে বলেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ইউক্রেন চেষ্টা করেছিল যেকোনো উপায়েই হোক আলোচনা থেকে বেরিয়ে যেতে, রাশিয়া সেটা করেনি, বরং ৬ হাজার মৃতদেহ হস্তান্তর করে কিয়েভকে বিপদে ফেলেছে। কেননা এত দিন যদি এই সেনাদের নিখোঁজ হিসেবে দেখানো হত, এখন সেটা করা তো যাবেই না, বরং তাদের পরিবারবর্গকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই আক্রমণের মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে ব্রিয়ানস্ক ও কুরস্ক প্রদেশে দুটো বেসামরিক ট্রেনে আঘাত হেনে কিয়েভ নিজেকে সন্ত্রাসবাদী রেজিম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই প্রথমবারের মত পুতিন কিয়েভের ক্ষমতাসীনদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হয়তো পরবর্তীতে সেভাবেই তাদের ট্রিট করা হবে।
এখন আসা যাক মেমোরেন্ডামের কথায়। রাশিয়ায় পক্ষ থেকে দেয়া সেই মেমোরেন্ডামে নিম্ন দাবীগুলো উল্লেখ করা হয়েছে – ১) রাশিয়ার অংশ হিসেবে ক্রিমিয়া, লুগানস্ক, দানিয়েৎস্ক, হেরসন ও জাপারঝিয়াকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দান ও সেখান থেকে ইউক্রেনের সমস্ত সৈন্য ও আরটিলারি অপসারণ; ২) ইউক্রেনের নিরপেক্ষ স্ট্যাটাস, যেকোনো ধরণের সামরিক ব্লকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা ও নিজ দেশে তৃতীয় কোন দেশের সামরিক ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা করতে না দেয়া; ৩) ইতিমধ্যে কোন ধরণের সামরিক চুক্তি থেকে থাকলে সেটা রহিত করা ও নতুন চুক্তি না করা; ৪) ইউক্রেন ভূখণ্ডে যেকোনো ধরণের পারমাণবিক অস্ত্র গ্রহণ, পরিবহন বা স্থাপনের উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ; ৫) ইউক্রেনে সেনাসদস্য ও সমরাস্ত্রের সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর অধীনে গঠিত ফ্যাসীবাদী সামরিক কাঠামো (যেমন আজভ) বিলোপ; ৬) রুশ ভাষাভাষী ইউক্রেন নাগরিকদের নাগরিক অধিকার পরিপূর্ণ ভাবে নিশ্চিত করা, রুশ ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দান; ৭) ফ্যাসিবাদের প্রোপ্যাগান্ডা এবং ফ্যাসিস্ট নেতাদের বীর হিসেবে মর্যাদা দেবার উপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সমস্ত রকমের ফ্যাসিবাদী সংগঠন ও রাজনৈতিক দল বিলোপ করা; ৮) বর্তমানে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সক্রিয় বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া ও নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা; ৯) যুদ্ধ কালীন সময়ে যেসব পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে তাদের একত্রিত করার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা; ১০) যুদ্ধের সময় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে পারস্পরিক দাবি মওকুফ; ১১) রুশ অর্থোডক্স চার্চের উপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া; ১২) স্টেপ বাই স্টেপ দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করা। এছাড়াও যুদ্ধ বিরতির ব্যাপারে ১০ টি ও সেগুলো বাস্তবায়িত করার টাইম ফ্রেম নিয়ে আরও ৯ টি দাবি উল্লেখ করা হয়েছে মেমোরেন্ডামে। পশ্চিমা বিশ্ব এ নিয়ে মতামত দিতে শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক শুরু হয়েছে টেরিটরি নিয়ে, বিশেষ করে নতুন চার প্রদেশের সেসব অঞ্চল যা এখনও ইউক্রেন সেনাদের দখলে। অন্য একটি বিতর্কিত বিষয় হল ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এবং তার নিরপেক্ষ স্ট্যাটাস। এখনও সেখানে ফ্যাসিস্ট দলগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী। চাইলেই তাদের নাই করে দেয়া যাবে না। আইনত ভাবে নিষিদ্ধ হলেও আন্ডারগ্রাউন্ডে তারা কাজ করতেই পারে, যা এতদিন করেছে। প্রশ্ন উঠবে রুশ ভাষা ও চার্চ নিয়ে। আসলে দেশ সেই ১৯৯১ সাল থেকেই দুই ভাগে বিভক্ত। রাশিয়ার আক্রমণের পরে রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকেই হয়তো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, কিন্তু নেতৃত্বের অদক্ষতা, করাপশন, জোর করে সবাইকে যুদ্ধে পাঠানো – ইত্যাদি প্রথম দিকের রুশ বিরোধিতা কিছুটা হলেও কমিয়ে এনেছে। আর এ কারণেই সেখানে আজ পর্যন্ত কোন ধরণের গেরিলা বাহিনী গড়ে ওঠেনি, সাধারণ মানুষ রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি যেটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। সমস্যা মানুষের নয়, সমস্যা নেতৃত্বে, নেতাদের লোভ লালসায়। দেশ বা মানুষ তাদের কাছে অর্থ উপার্জনের পণ্য। সেখানে জড়ো হয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার নিওলিবারেল গোষ্ঠী, যাদের কাছে মানুষ আসলে মানুষ নয়, তাদের আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার সৈনিক যাদের অনায়াসে এসব আদর্শের যূপকাষ্ঠে বলি দেয়া যায়। আজ ইউরোপে যে যুদ্ধের দামামা সেটা সেই একই কারণে। ২০৩০ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। যদি এর আগে সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে না পারে তাহলে মানব সভ্যতাকে ইমাম মেহেদী বা কল্কি অবতারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। তাদের ইউরোপিয়ান গুরুরাই দক্ষতার সাথে মানব সভ্যতা ধ্বংস করতে সক্ষম। সেটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। কয়েক লাখ বছর পরে হয়তো নতুন কোন প্রাণী নিজদের মধ্যে তর্ক করবে কীভাবে মানুষ নামক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল পৃথিবীর বুক থেকে ঠিক এখন যেমন আমরা করি ডাইনোসারদের নিয়ে। পৃথিবী সর্বংসহা। এক প্রজাতি যাবে, আরেক প্রজাতি আসবে। পৃথিবী ঠিকই নতুন কাউকে সুযোগ দেবে তাকে নতুন করে সাজাতে। মূষিক আবার সিংহ হবে, পৃথিবী ধ্বংস করতে চাইবে আর মুনির অভিশাপে আবার মূষিকে রূপান্তরিত হবে। এভাবে চলবে যতদিন সূর্য তাকে আলো আর তাপ দেবে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৬ জুন ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
https://www.progotirjatree.com/2025/06/06/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a7%a8%e0%a7%a6%e0%a7%a9-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d/



Comments
Post a Comment