বিজ্ঞান ভাবনা (১৮৮): একুশের ভাবনা
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ছোটবেলায় এই দিনটি আমাদের কাছে শহীদ দিবস নামে পরিচিত ছিল। একাত্তরে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি তার বীজ বপন করা হয়েছিল বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। আর তাই বাংলাদেশে ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে একুশ সবচেয়ে উজ্জ্বল দিন। মনে হয় স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথম একুশ পালিত হচ্ছে এক অদ্ভুত পরিবেশে। কোন দেশ বা জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোককাহিনী সবই গড়ে ওঠে ভাষাকে কেন্দ্র করই অথবা বলা চলে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোককাহিনী এসব একই সূত্রে গাথা। তাই আজ যখন তৌহিদী জনতা বা মবের হাতে একের পর এক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ বা নিষিদ্ধ হচ্ছে, যখন বইমেলায় ঘোষণা দিয়ে বুক স্টল লন্ডভন্ড করা হচ্ছে আর সরকার সব দেখেও না দেখার ভান করছে তখন একুশের প্রতি এদের কমিটমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক।
২০১০ সালে আমরা বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া নামে এক সংগঠন গড়ে তুলি। তখন মস্কোয় ছাত্রদের সংগঠন ছিল, চেম্বার্স অফ কমার্স ছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠন ছিল কিন্তু যারা এসবের বাইরে ও অল্প আয়ের মানুষ সেই সব বাংলাদেশীদের কোন সংগঠন ছিল না। তাই এই সংগঠন সৃষ্টি। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বাংলাদেশীদের একত্রিত করা, পরস্পরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। ঐ সময় মস্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন সাইফুল হক। উনি সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখাপড়া করেছেন। তাই আমাকে দায়িত্ব দেয়া হল তাকে নতুন সংগঠনের বিষয়ে অবগত করতে।
- তোমরা নতুন সংগঠন করছ। এখানে হোমরা চোমরা ব্যবসায়ীরা কি তা করতে দেবে?
- আমাদের সংগঠন কারো বিরুদ্ধে নয়। আমাদের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র থাকবে। সেটা মেনে যে কেউ এখানে আসতে পারবে। আমরা কারো অনুমতি নেব না তবে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাব আমাদের সংগঠনের সদস্য হতে।
- তোমাদের ঘোষণাপত্র পাঠিয়ে দিও।
গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র লেখার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। বেশ কিছু সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমাদের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র তৈরি করি। ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়। একদিন রাষ্ট্রদূত আমাকে ফোন করে বলেন ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করতে।
- আমরা অরাজনৈতিক না হলেও নির্দলীয় সংগঠন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সব কিছুই সেখানে আছে। তাঁর নাম ঘোষণাপত্রে লেখা কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ?
- আমি বলছি এটা করতে।
- পরবর্তী রাষ্ট্রদূত যদি সেটা উঠিয়ে দিয়ে অন্য নাম যোগ করতে বলেন?
এরপর থেকেই উনি আমাদের প্রতি বিমাতা সুলভ আচরণ করতে শুরু করেন। নিজেদের মধ্যে অনেক বাকবিতন্ডা হয় এ নিয়ে। প্রায় ছয় মাস পরে অনেক সভা সমিতি ও বাকবিতন্ডার মধ্য দিয়ে প্রথম প্রস্তাবিত ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়। হঠাৎ এই গল্প কেন? দীর্ঘ বিরতির পরে দেশে গিয়ে দেখেছি কীভাবে পরিবার ও দলের বা জোটের লোকজনের নামে নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ভবন বা রাস্তাঘাটের। বিভিন্ন দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট দেশের কৃতিসন্তানদের নামে নামকরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শুধু পারিবারিক কারণেও এ ধরণের ঘটনা ঘটেছে যা দৃষ্টিকটূ। অন্য দিকে বর্তমানে নাম বদলের হিড়িকে এমন অনেকের নাম মুছে দেয়া হচ্ছে যারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং যাদের অবদান বাংলা ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয়। এসব ঘটনা জাতির ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। শুধু তাই নয় যেভাবে বেছে বেছে নাম বাদ দেয়া হচ্ছে তাতে এক বিশেষ রাজনীতির গন্ধ সেখানে পাওয়া যায়। আর এটা যে সমস্ত আদর্শিক ভিত্তির উপর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গড়ে উঠেছিল তার পরিপন্থী। এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে - দেশকে আজ একুশের চেতনার উল্টো পথে চালানোর এক গভীর চক্রান্ত কার্যকরী করা হচ্ছে।
২০১৪ সালে আমি দিন দশেকের জন্য পুনায় ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর আস্ট্রোনমি আন্ড আস্ট্রোফিজিক্সে ছিলাম শিক্ষা সফরে। সেখানে নিরামিষ মেন্যু, যদিও আগে অর্ডার দিলে মাংস সার্ভ করে। আমার যে মাংস ছাড়া দিন চলে না তা নয় তবে চেয়েও মাংস পাচ্ছি না সেটা আমাকে মানসিক ভাবে অস্থির করে তোলে যদিও চাইলেই ক্যাম্পাসের বাইরে কোন হোটেলে বা রেস্টুরেন্টে মাংস খেতেই পারতাম। এখন বাংলাদেশে মব, তৌহিদী জনতার নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে যার অনেকটাই আমাদের সংস্কৃতির সাথে, আমাদের রক্তের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখনও হয়তো মানুষ এটাকে কিছু মানুষের বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখছে, আসল বিপদটা দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু এভাবে যদি সমস্ত বিনোদন আইন করে নিষিদ্ধ করা হয় তখন সেটা ফিরে পেতে অনেক রক্ত ঝরাতে হব যেমন হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এখন যারা ভাবছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হলেও তারা পার পেয়ে যাবে তারাও একদিন নিষিদ্ধ হবে। ইতিহাস সেটাই বলে। অন্য দিকে যারা নিষিদ্ধ করছে তাদেরও মনে রাখা দরকার নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত করার কারণেই পাকিস্তান ভেঙেছে, শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। জনগণের সহ্যের একটা সীমা আছে। লোক সংস্কৃতি তার জন্য মাছ ভাতের মতই বা বলা যায় খাদ্যাভ্যাসও এক ধরণের লোক সংস্কৃতি। কিছু দিন এসব থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখা যায়, কিন্তু বঞ্চনা দীর্ঘ হলে একদিন সে প্রতিবাদ করবেই। ফলাফল জানার জন্য খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা – এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। তার মানে এই নয় মানুষকে যেকোনো খাদ্য, যেকোনো বস্ত্র, যেকোনো বাসস্থান, যেকোনো শিক্ষা বা যেকোনো চিকিৎসা দিলেই সে খুশী। ২০১৬ সালে দেশে ফেরার সময় দুবাই এয়ারপোর্টে একদল বাংলাদেশী শ্রমিকের সাথে দেখা। ওরা কাতারে কাজ করত। সে সময় ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের স্টেডিয়াম তৈরির কাজে নিযুক্ত ছিল ওরা। কথায় কথায় বলল, সেখানে ওরা কাজ করত ভারতীয় ও পাকিস্তানি শ্রমিকদের সাথে। প্রতিদিন খাবার ছিল রুটি আর বুটের ডাল। এই নিয়ে স্থানীয় মালিকদের সাথে বাংলাদেশীদের ঝগড়া, মারামারি। তার ফলশ্রুতিতে ওদের দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। তাই ভাতে মাছে বাঙালি কথাটা শুধু কথার কথা নয়। হিজাব না পরতে দেয়াটা যেমন যারা হিজাব পরে তাদের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ, হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করাও তেমনি যারা পরতে চায়না তাদের ওপর জুলুম। আমরা হয়তো প্রতিদিন বাউলের গান শুনি না, শুনি না জারি গান, কবি গান বা লালন গীতি। কিন্তু চাইলেই শুনতে পারি। যখনই সেটা আইন করে বা জোর করে নিষিদ্ধ করা হয় তখনই আমাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়। হালকা বোঝাও দীর্ঘ সময় ধরে টানার পরে ভারী লাগে। এটাও তাই।
প্রধান উপদেষ্টা ডঃ ইউনুস বলেছেন "কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয় করে ফেলি আমরা। এর সাথে একটি করে নার্সিং কলেজ করে দিলেই আমরা অনেক নার্স পেতে পারি। বিশ্বে নার্সের চাহিদা কোনদিন শেষ হবে না।" সব ঠিক আছে। নার্সের দরকার আছে। কিন্তু বিশ্বে কোনদিন নার্সের অভাব হবে না এর মানে কি মানে আমরা দেশে হাসপাতাল তৈরি করব না? মানুষকে দেশের খরচে লেখাপড়া শিখিয়ে বিদেশে পাঠাবো? উনি উদ্যোগী হতে বলেন কিন্তু চাকরি করতে উৎসাহিত করেন না। তার মানে কি সরকার চাকরি সৃষ্টিতে আগ্রহী নয়? আগ্রহী শ্রমিক রপ্তানিতে? এতে দেশের কী লাভ হবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যা চলছে সেটাই বা কতটুকু যৌক্তিক। এখন স্পষ্ট যে কোটা আন্দোলন ছিল নিমিত্ত মাত্র, মেধাভিত্তিক চাকরির সুযোগও অনেকটা তাই। এই যে শিক্ষার্থীরা প্রায় সব ক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ চাইছে সেটাই বা কতটুকু যৌক্তিক? এটা কি তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেবে? পড়াশুনা না করে সার্টিফিকেট পাওয়া যায় কিন্তু জ্ঞান অর্জন করা যায় না। সমন্বয়ক বা বর্তমানের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা হয়তো বিপুল অর্থের মালিক হতে পারে। তারপর? যদি দেশে ভালো ডাক্তার, ভালো ইঞ্জিনিয়ার, ভালো শিক্ষক সৃষ্টি না হয় কে তাদের ঘর বানাবে, কে করবে তাদের চিকিৎসা আর সে পড়াবে তাদের ছেলেমেয়েদের? তাই শুধু দেশ নয় এমনকি নিজেদের প্রয়োজনেও সঠিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আর সেটা পেতে হলে ছাত্রেদের ফিরে যেতে হবে ক্লাস রুমে, ফিরে যেতে হবে সুস্থ ছাত্র রাজনীতির বলয়ে। ইতিহাস বলে আমাদের সমস্যা ছাত্র রাজনীতি নয়, সমস্যা ছাত্র রাজনীতির অভাব, সমস্যা ছাত্র রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি, রগ কাটা ইত্যাদি।
আমাদের দেশে বড় মানেই সঠিক। এই বড় অবশ্য বিভিন্ন ভাবে হতে পারে। বয়সে বড়, পদে বড়, সামাজিক অবস্থানে বড়। পরিবারে যেমন বাবা-মা, বড় ভাইবোন সমাজে তেমনি সামাজিক অবস্থান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, চাকরি ক্ষেত্রে পদ। আর কেউ যদি একবার মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হতে পারে তাহলে তো আর কথাই নেই। তারা যা বলে সেটাই একমাত্র সত্য আর যা করে সেটাই একমাত্র না হলেও সবচেয়ে ভালো সমাধান। আর এ সবই আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে জড়িত। তাই যখন কোন উপদেষ্টা বলে দেশে বর্তমানে সাংস্কৃতিক পরিবেশ যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো এটা তার ভুল নয়, এটা পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একই ভাবে যখন ক্ষমতাসীনরা বলে দেশে সব ঠিক আছে সেটা সেই একই বয়ান। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে কিছু দিন আগে বিগত সরকারও একই কথা বলত আর জনগণ সহ বর্তমান সরকারের অনেকেই সেটা সঠিক মনে করত না বলেই সেই সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছে।
অনেকের ধারণা মৌলবাদীদের পেছনে কোন জনসমর্থন নেই। নির্বাচন দিলেই এরা সব হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। অন্য দিকে কেউ কেউ ভাবে বাংলাদেশে আজ যে অনাচার চলছে সেটা মাত্র ৩ থেকে ৫% মানুষকে বিচলিত করে। দেশের ৯৫% মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাসে এতটাই অন্ধ যে বর্তমান পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিক মনে করে। কিন্তু এই ৩ থেকে ৫% মানুষ ফেলনা নয়। সারা বিশ্বে এই অল্প সংখ্যক মানুষই দেশ চালায়। যেকোনো দলবদ্ধ প্রাণীর জন্যই এটা সত্য। সবাই একজন নেতার পেছনে চলে। মানুষও তাই। এজন্যেই যুদ্ধ সব সময় হয় রাজায় রাজায় - মানে ক্ষমতার জন্য। যে ক্ষমতায় যেতে পারে সেই নীতি নির্ধারণ করে। আর এ জন্যেই ৯৫% মানুষ বিপক্ষে ভেবে হাল ছাড়লে চলবে না। পাবলিক সেন্টিমেন্ট নিয়ে ম্যানিপুলেশন সব দেশেই হয়, হচ্ছে। রাজনীতি বা আদর্শ এটাও পণ্য - যে ডিলার তোমার পয়াসায় বা তোমার স্বার্থের বিনিময়ে তোমার কাছে তার ভাবনা গছিয়ে দিতে পারবে সেই জিতবে। আমরা যদি না পারি তার অর্থ আমাদের মার্কেটিং মেথড ভালো নয়। ভালো দোকানদার কাস্টমার ধরে রাখার জন্য নতুন নতুন কিছু আপস অ্যাড করে, আমাদের দেশে সবাই গায়ের জোরে সেটা করতে চায়। সমস্যা এখানেই।
আমাদের দেশে কে একজন বলতে ভালবাসত যে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনার গোলাপি স্বপ্নে বিভোর হয়ে সে এখন নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বলা হয়ে থাকে যে কোন ঘটনা যদি একবার ঘটে সেটা আকস্মিক, দু’বার ঘটলে তা কাকতালীয় আর তিন বার ঘটলে সেটা নিয়ম। এখন দেশে যা ঘটছে সেটা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সেটা এখন নিয়ম। সময় থাকতে প্রতিরোধ করতে না পারলে এটাই হবে আইন। একুশ আমাদের আবার ঐক্যবদ্ধ করুক সব ধরণের মববাজির বিরুদ্ধে। শহীদ স্মৃতি অমর হোক!
বিঃ দ্রঃ লেখাটি ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
২০১০ সালে আমরা বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া নামে এক সংগঠন গড়ে তুলি। তখন মস্কোয় ছাত্রদের সংগঠন ছিল, চেম্বার্স অফ কমার্স ছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠন ছিল কিন্তু যারা এসবের বাইরে ও অল্প আয়ের মানুষ সেই সব বাংলাদেশীদের কোন সংগঠন ছিল না। তাই এই সংগঠন সৃষ্টি। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বাংলাদেশীদের একত্রিত করা, পরস্পরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। ঐ সময় মস্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন সাইফুল হক। উনি সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখাপড়া করেছেন। তাই আমাকে দায়িত্ব দেয়া হল তাকে নতুন সংগঠনের বিষয়ে অবগত করতে।
- তোমরা নতুন সংগঠন করছ। এখানে হোমরা চোমরা ব্যবসায়ীরা কি তা করতে দেবে?
- আমাদের সংগঠন কারো বিরুদ্ধে নয়। আমাদের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র থাকবে। সেটা মেনে যে কেউ এখানে আসতে পারবে। আমরা কারো অনুমতি নেব না তবে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাব আমাদের সংগঠনের সদস্য হতে।
- তোমাদের ঘোষণাপত্র পাঠিয়ে দিও।
গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র লেখার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। বেশ কিছু সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমাদের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র তৈরি করি। ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়। একদিন রাষ্ট্রদূত আমাকে ফোন করে বলেন ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করতে।
- আমরা অরাজনৈতিক না হলেও নির্দলীয় সংগঠন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সব কিছুই সেখানে আছে। তাঁর নাম ঘোষণাপত্রে লেখা কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ?
- আমি বলছি এটা করতে।
- পরবর্তী রাষ্ট্রদূত যদি সেটা উঠিয়ে দিয়ে অন্য নাম যোগ করতে বলেন?
এরপর থেকেই উনি আমাদের প্রতি বিমাতা সুলভ আচরণ করতে শুরু করেন। নিজেদের মধ্যে অনেক বাকবিতন্ডা হয় এ নিয়ে। প্রায় ছয় মাস পরে অনেক সভা সমিতি ও বাকবিতন্ডার মধ্য দিয়ে প্রথম প্রস্তাবিত ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়। হঠাৎ এই গল্প কেন? দীর্ঘ বিরতির পরে দেশে গিয়ে দেখেছি কীভাবে পরিবার ও দলের বা জোটের লোকজনের নামে নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ভবন বা রাস্তাঘাটের। বিভিন্ন দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট দেশের কৃতিসন্তানদের নামে নামকরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শুধু পারিবারিক কারণেও এ ধরণের ঘটনা ঘটেছে যা দৃষ্টিকটূ। অন্য দিকে বর্তমানে নাম বদলের হিড়িকে এমন অনেকের নাম মুছে দেয়া হচ্ছে যারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং যাদের অবদান বাংলা ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয়। এসব ঘটনা জাতির ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। শুধু তাই নয় যেভাবে বেছে বেছে নাম বাদ দেয়া হচ্ছে তাতে এক বিশেষ রাজনীতির গন্ধ সেখানে পাওয়া যায়। আর এটা যে সমস্ত আদর্শিক ভিত্তির উপর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গড়ে উঠেছিল তার পরিপন্থী। এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে - দেশকে আজ একুশের চেতনার উল্টো পথে চালানোর এক গভীর চক্রান্ত কার্যকরী করা হচ্ছে।
২০১৪ সালে আমি দিন দশেকের জন্য পুনায় ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর আস্ট্রোনমি আন্ড আস্ট্রোফিজিক্সে ছিলাম শিক্ষা সফরে। সেখানে নিরামিষ মেন্যু, যদিও আগে অর্ডার দিলে মাংস সার্ভ করে। আমার যে মাংস ছাড়া দিন চলে না তা নয় তবে চেয়েও মাংস পাচ্ছি না সেটা আমাকে মানসিক ভাবে অস্থির করে তোলে যদিও চাইলেই ক্যাম্পাসের বাইরে কোন হোটেলে বা রেস্টুরেন্টে মাংস খেতেই পারতাম। এখন বাংলাদেশে মব, তৌহিদী জনতার নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে যার অনেকটাই আমাদের সংস্কৃতির সাথে, আমাদের রক্তের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখনও হয়তো মানুষ এটাকে কিছু মানুষের বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখছে, আসল বিপদটা দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু এভাবে যদি সমস্ত বিনোদন আইন করে নিষিদ্ধ করা হয় তখন সেটা ফিরে পেতে অনেক রক্ত ঝরাতে হব যেমন হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এখন যারা ভাবছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হলেও তারা পার পেয়ে যাবে তারাও একদিন নিষিদ্ধ হবে। ইতিহাস সেটাই বলে। অন্য দিকে যারা নিষিদ্ধ করছে তাদেরও মনে রাখা দরকার নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত করার কারণেই পাকিস্তান ভেঙেছে, শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। জনগণের সহ্যের একটা সীমা আছে। লোক সংস্কৃতি তার জন্য মাছ ভাতের মতই বা বলা যায় খাদ্যাভ্যাসও এক ধরণের লোক সংস্কৃতি। কিছু দিন এসব থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখা যায়, কিন্তু বঞ্চনা দীর্ঘ হলে একদিন সে প্রতিবাদ করবেই। ফলাফল জানার জন্য খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা – এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। তার মানে এই নয় মানুষকে যেকোনো খাদ্য, যেকোনো বস্ত্র, যেকোনো বাসস্থান, যেকোনো শিক্ষা বা যেকোনো চিকিৎসা দিলেই সে খুশী। ২০১৬ সালে দেশে ফেরার সময় দুবাই এয়ারপোর্টে একদল বাংলাদেশী শ্রমিকের সাথে দেখা। ওরা কাতারে কাজ করত। সে সময় ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের স্টেডিয়াম তৈরির কাজে নিযুক্ত ছিল ওরা। কথায় কথায় বলল, সেখানে ওরা কাজ করত ভারতীয় ও পাকিস্তানি শ্রমিকদের সাথে। প্রতিদিন খাবার ছিল রুটি আর বুটের ডাল। এই নিয়ে স্থানীয় মালিকদের সাথে বাংলাদেশীদের ঝগড়া, মারামারি। তার ফলশ্রুতিতে ওদের দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। তাই ভাতে মাছে বাঙালি কথাটা শুধু কথার কথা নয়। হিজাব না পরতে দেয়াটা যেমন যারা হিজাব পরে তাদের অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ, হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করাও তেমনি যারা পরতে চায়না তাদের ওপর জুলুম। আমরা হয়তো প্রতিদিন বাউলের গান শুনি না, শুনি না জারি গান, কবি গান বা লালন গীতি। কিন্তু চাইলেই শুনতে পারি। যখনই সেটা আইন করে বা জোর করে নিষিদ্ধ করা হয় তখনই আমাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়। হালকা বোঝাও দীর্ঘ সময় ধরে টানার পরে ভারী লাগে। এটাও তাই।
প্রধান উপদেষ্টা ডঃ ইউনুস বলেছেন "কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয় করে ফেলি আমরা। এর সাথে একটি করে নার্সিং কলেজ করে দিলেই আমরা অনেক নার্স পেতে পারি। বিশ্বে নার্সের চাহিদা কোনদিন শেষ হবে না।" সব ঠিক আছে। নার্সের দরকার আছে। কিন্তু বিশ্বে কোনদিন নার্সের অভাব হবে না এর মানে কি মানে আমরা দেশে হাসপাতাল তৈরি করব না? মানুষকে দেশের খরচে লেখাপড়া শিখিয়ে বিদেশে পাঠাবো? উনি উদ্যোগী হতে বলেন কিন্তু চাকরি করতে উৎসাহিত করেন না। তার মানে কি সরকার চাকরি সৃষ্টিতে আগ্রহী নয়? আগ্রহী শ্রমিক রপ্তানিতে? এতে দেশের কী লাভ হবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যা চলছে সেটাই বা কতটুকু যৌক্তিক। এখন স্পষ্ট যে কোটা আন্দোলন ছিল নিমিত্ত মাত্র, মেধাভিত্তিক চাকরির সুযোগও অনেকটা তাই। এই যে শিক্ষার্থীরা প্রায় সব ক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ চাইছে সেটাই বা কতটুকু যৌক্তিক? এটা কি তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেবে? পড়াশুনা না করে সার্টিফিকেট পাওয়া যায় কিন্তু জ্ঞান অর্জন করা যায় না। সমন্বয়ক বা বর্তমানের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা হয়তো বিপুল অর্থের মালিক হতে পারে। তারপর? যদি দেশে ভালো ডাক্তার, ভালো ইঞ্জিনিয়ার, ভালো শিক্ষক সৃষ্টি না হয় কে তাদের ঘর বানাবে, কে করবে তাদের চিকিৎসা আর সে পড়াবে তাদের ছেলেমেয়েদের? তাই শুধু দেশ নয় এমনকি নিজেদের প্রয়োজনেও সঠিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আর সেটা পেতে হলে ছাত্রেদের ফিরে যেতে হবে ক্লাস রুমে, ফিরে যেতে হবে সুস্থ ছাত্র রাজনীতির বলয়ে। ইতিহাস বলে আমাদের সমস্যা ছাত্র রাজনীতি নয়, সমস্যা ছাত্র রাজনীতির অভাব, সমস্যা ছাত্র রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি, রগ কাটা ইত্যাদি।
আমাদের দেশে বড় মানেই সঠিক। এই বড় অবশ্য বিভিন্ন ভাবে হতে পারে। বয়সে বড়, পদে বড়, সামাজিক অবস্থানে বড়। পরিবারে যেমন বাবা-মা, বড় ভাইবোন সমাজে তেমনি সামাজিক অবস্থান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, চাকরি ক্ষেত্রে পদ। আর কেউ যদি একবার মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হতে পারে তাহলে তো আর কথাই নেই। তারা যা বলে সেটাই একমাত্র সত্য আর যা করে সেটাই একমাত্র না হলেও সবচেয়ে ভালো সমাধান। আর এ সবই আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে জড়িত। তাই যখন কোন উপদেষ্টা বলে দেশে বর্তমানে সাংস্কৃতিক পরিবেশ যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো এটা তার ভুল নয়, এটা পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একই ভাবে যখন ক্ষমতাসীনরা বলে দেশে সব ঠিক আছে সেটা সেই একই বয়ান। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে কিছু দিন আগে বিগত সরকারও একই কথা বলত আর জনগণ সহ বর্তমান সরকারের অনেকেই সেটা সঠিক মনে করত না বলেই সেই সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছে।
অনেকের ধারণা মৌলবাদীদের পেছনে কোন জনসমর্থন নেই। নির্বাচন দিলেই এরা সব হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। অন্য দিকে কেউ কেউ ভাবে বাংলাদেশে আজ যে অনাচার চলছে সেটা মাত্র ৩ থেকে ৫% মানুষকে বিচলিত করে। দেশের ৯৫% মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাসে এতটাই অন্ধ যে বর্তমান পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিক মনে করে। কিন্তু এই ৩ থেকে ৫% মানুষ ফেলনা নয়। সারা বিশ্বে এই অল্প সংখ্যক মানুষই দেশ চালায়। যেকোনো দলবদ্ধ প্রাণীর জন্যই এটা সত্য। সবাই একজন নেতার পেছনে চলে। মানুষও তাই। এজন্যেই যুদ্ধ সব সময় হয় রাজায় রাজায় - মানে ক্ষমতার জন্য। যে ক্ষমতায় যেতে পারে সেই নীতি নির্ধারণ করে। আর এ জন্যেই ৯৫% মানুষ বিপক্ষে ভেবে হাল ছাড়লে চলবে না। পাবলিক সেন্টিমেন্ট নিয়ে ম্যানিপুলেশন সব দেশেই হয়, হচ্ছে। রাজনীতি বা আদর্শ এটাও পণ্য - যে ডিলার তোমার পয়াসায় বা তোমার স্বার্থের বিনিময়ে তোমার কাছে তার ভাবনা গছিয়ে দিতে পারবে সেই জিতবে। আমরা যদি না পারি তার অর্থ আমাদের মার্কেটিং মেথড ভালো নয়। ভালো দোকানদার কাস্টমার ধরে রাখার জন্য নতুন নতুন কিছু আপস অ্যাড করে, আমাদের দেশে সবাই গায়ের জোরে সেটা করতে চায়। সমস্যা এখানেই।
আমাদের দেশে কে একজন বলতে ভালবাসত যে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনার গোলাপি স্বপ্নে বিভোর হয়ে সে এখন নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বলা হয়ে থাকে যে কোন ঘটনা যদি একবার ঘটে সেটা আকস্মিক, দু’বার ঘটলে তা কাকতালীয় আর তিন বার ঘটলে সেটা নিয়ম। এখন দেশে যা ঘটছে সেটা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সেটা এখন নিয়ম। সময় থাকতে প্রতিরোধ করতে না পারলে এটাই হবে আইন। একুশ আমাদের আবার ঐক্যবদ্ধ করুক সব ধরণের মববাজির বিরুদ্ধে। শহীদ স্মৃতি অমর হোক!
বিঃ দ্রঃ লেখাটি ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে



Comments
Post a Comment