বিজ্ঞানমনস্কতা - পর্ব ৬
আমরা এর আগেও প্রশ্ন করেছি বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞানের কী একক কোন সংজ্ঞা আছে?
ছোটবেলায় জানতাম বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনেক সংজ্ঞাই যোগ
হয়েছে আমার ভাণ্ডারে। এর আগে বিজ্ঞানের কয়েকটি সংজ্ঞা দেবার চেষ্টা করেছি। এখন সেটাই
একটু ভিন্ন ভাবে বলব।
বিজ্ঞান হল সত্যের সন্ধান আর বিজ্ঞানী সত্যান্বেষী। বিশেষ করে আমরা যখন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের
কথা বলি। এটা ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, জিওলজি, জিওগ্রাফি, অ্যাস্ট্রোনমি, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইত্যাদি, মানে সেই সব বিষয় যেখানে প্রকৃতি, পৃথিবী,
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহতারা, জীব জগতের গঠন, বিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা
হয়। বিজ্ঞানী জানতে চায় কেন, কীভাবে এসবের সৃষ্টি, কীভাবেই বা তাদের বিবর্তন হচ্ছে,
কোথায় তারা যাচ্ছে আর এসব সে জানতে চায় জানার আনন্দ থেকে, জানার আগ্রহ থেকে, এই জ্ঞান
তাঁর পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে কিনা সেটা না ভেবে। কিন্তু যখনই বিজ্ঞানী লব্ধ জ্ঞান তাঁর
উপকারে আসবে কিনা সে নিয়ে আগ্রহী বা চিন্তিত হয়ে ওঠেন তিনি আর তখন সত্যান্বেষী থাকেন
না, হয়ে ওঠেন স্বার্থান্বেষী। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন বিজ্ঞানী নিজের জন্য না হলেও
তো সবার বা মানব জাতির স্বার্থের কথা ভেবে কাজ করেন। সেটা কি স্বার্থপরতা নয়? আচ্ছা
বলুন তো কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিও নিজেদের আসন্ন বিপদের কথা জেনেও বা তাদের আবিষ্কার
কারও জন্যই কোন তাৎক্ষনিক উপকার বয়ে আনবে না সেটা জেনেও যখন বলেছিলেন পৃথিবী সূর্যের
চারিদিকে ঘোরে তখন তারা কি করেছিলেন? হ্যাঁ, কোন রকম লাভলোকসানের কথা না ভেবে সত্য
প্রকাশ করেছেন। সত্য কারও জন্য উপকার বয়ে আনতে পারে তাতে সন্দেহ নেই, কথা হচ্ছে উপকারে
আসবে কি আসবে না সেটা যেন আমাদের সত্য সন্ধান প্রভাবিত না করে। রাজনীতিতে এমনটা প্রায়ই
দেখা যায় যে কোন সত্য যদি ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে যায় সেটা হয় প্রকাশ করা হয় না অথবা
করলেও এমনভাবে করা হয় যেন তাতে ক্ষমতাসীনরা ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। আইনের শাসন মানে সত্য
উদ্ঘাটন করা, কিন্তু যদি আইনকে সত্য বলতে বাধা দেওয়া হয় বা শুধু সেই সত্য প্রকাশ করতে
দেওয়া হয় যা নিজেদের বিপক্ষে না যায়, সেটা আর যাই হোক আইনের শাসন থাকে না। আইন তখন
বেআইনি হয়ে যায়।
অনেকেই বলেন যারা ধার্মিক তারাও তো নিজেদের সত্যান্বেষী বলেন। তাহলে বিজ্ঞানের
সাথে তাদের পার্থক্য কোথায়? – অনেক আগে যখন ধর্ম বই পড়তাম অনেক কিছুই আমার কাছে যৌক্তিক
মনে হত। বলা হত ঈশ্বর নিরাকার এ জন্যে নয় যে তাঁর কোন আকার নেই, তিনি ইচ্ছামত আকার
ধারণ করতে পারেন বলেই তিনি নিরাকার। সত্য মিথ্যা জানি না, তবে তখন আমার মনে হত তিনি
যদি সর্ব শক্তিমান হন তাহলে সেটা তো অসম্ভব কিছু নয়। আবার ধরুন বলা হত তিনি সর্বভূতে
বিদ্যমান। সেটাই যদি হয় ঈশ্বর কেন শুধু মন্দিরে থাকবেন, গির্জা বা মসজিদে থাকতে পারবেন
না? আবার বলা হয় তিনি সর্বজ্ঞ। তাহলে তিনি সবই জানেন, কে পাপ করছে, কে পুণ্য করছে সেটাও
জানেন। তাহলে তিনিই তো নিজের মত করে সবাইকে তাঁর পথে আনতে পারেন। কেন করছেন না? তাহলে
হয় তিনি সর্ব শক্তিমান, সর্বভূতে বিদ্যমান বা সর্বজ্ঞ নন অথবা এই বহুত্বের মধ্যেই তিনি
নিজের শক্তি দেখেন, বহু মতের মধ্যেই নিজের সঠিক প্রকাশ দেখেন। যে সব বিশ্বাসীরা তাঁকে
শুধু নিজেদের উপাসনালয়ে আটকে রাখতে চায়, তাঁর হয়ে অন্যদের বিচার করতে চায় তারা আসলে
ঈশ্বরের শক্তিতে বিশ্বাস করে না, ঈশ্বরকে, ঈশ্বরের নামকে নিয়ে বাণিজ্য করে। তাই ধার্মিক
যখন সত্যের সন্ধান করে আর ভাবে শুধুমাত্র তার সত্যটাই একমাত্র সত্য তাহলে সে আর সত্যান্বেষী
থাকে না, হয় স্বার্থান্বেষী কেননা সে এই সত্যের সন্ধানে নেমে শুধু তার নিজের ধর্মের
স্বার্থের কথাই মাথায় রাখে। যদিও ধর্মের উৎপত্তি রাজনীতির অনেক আগে তবে বর্তমানে ধর্ম
অনেকটাই রাজনৈতিক দলের মত। একদিকে ধর্ম রাজনীতিকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের
জন্য, অন্যদিকে রাজনীতি ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলো অন্য দলের অস্তিত্ব স্বীকার করে, অন্য দলকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ
চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় আর এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের প্রতি তাদের আস্থার কথা জানায়,
কিন্তু ধর্ম প্রায়ই অন্য ধর্মের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চায় না আর এভাবেই তারা ঈশ্বরের
শক্তিকে প্রশ্ন করে। যে ঈশ্বরকে তারা সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বভূতে বিদ্যমান বলে
ঘোষণা করে, সেই ঈশ্বরকেই তারা নিজ নিজ ঘরে বন্দী করে রাখে, নিজ নিজ অন্ধত্বের আবরণে
ঢেকে রাখে। অনেক ধর্মেই ঈশ্বরকে সত্যের সাথে তুলনা করা হয়। কিন্তু সত্য তো নিরপেক্ষ। যদি সেটাই হয় তাহলে তিনি কেন শুধু ধর্মের কারণে একজনকে বেশি ভালবাসবেন, অন্যকে কম। ধর্ম কেন, মানুষের কর্মই তো হওয়া উচিৎ তাকে বিচার করার একমাত্র মাপকাঠি। আবার কেউ কেউ বলেন অমুক বার সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। সেটা কেন? বাররা তো কোন দোষ করেনি, সেটা তো মানুষ নিজেদের সুবিধার জনই তৈরি করেছে। তাহলে? এসব অতিভক্তিই কী ঈশ্বরকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলে না? বিজ্ঞান যেখানে সত্যকে
উন্মুক্ত করতে চায়, ধর্ম সেখানে সত্যকে গোপন রাখতে চায়, বিজ্ঞান যেখানে সত্যকে সবার
মধ্যে বিলিয়ে দিতে চায়, ধর্ম সেখানে সত্যকে কুক্ষিগত করতে চায়। ধর্মের তুলনায় বিজ্ঞানের
আরও একটা শক্তিশালী দিক হচ্ছে বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই, ধর্মে আছে আর এর ফলেই
বিজ্ঞান আমাদের ভবিষ্যতের পথ দেখায়, ধর্ম করে পশ্চাদগামী।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি প্রগতির যাত্রীতে ১৩ আগস্ট ২০২১ প্রকাশিত হয়েছে
https://www.progotirjatree.com/2021/08/13/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be-4/?fbclid=IwAR3_FyMw9WQWn3ieayjz5BvJ4XsYC9H6z0-2xcLOI0Fr-DnbeSTyglN16_s



Comments
Post a Comment