বিজ্ঞানমনস্কতা - পর্ব ৫
ইদানীং সিআরবি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। যতদূর বুঝি চট্টগ্রামের
ফুসফুস নামে পরিচিত এই শতবর্ষী গাছের উদ্যান বাঁচাতে অনেকেই মাঠে নেমেছে। এ নিয়েই আজ কিছু কথা বলব বিজ্ঞানমনস্কতার দৃষ্টিভঙ্গি
থেকে।
১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর যখন আমাদের নিয়ে এরোফ্লতের একটা তু-১৩৪ বিমান মস্কোর শেরমিতভা
বিমান বন্দরে নামার ঘোষণা দেয় নীচে তাকিয়ে দেখি শুধু বন আর বন, আর কত রং বেরঙের পাতায়
তা সাজানো। লাল, হলুদ, সবুজ – যেন রঙের হোলি খেলা চলছে নীচের বনে। আমাদের বাড়িতে রঙের
ব্যবসা ছিল, তাই বিভিন্ন রঙের সুতা দেখেই আমার বেড়ে ওঠা। তবুও বনের সেই রং দেখে অবাক
না হয়ে পারিনি। পরে দেখলাম শুধু শহরতলী নয়, সারা মস্কো শহরই গাছপালা দিয়ে ভর্তি। আমরা
যে হোস্টেলগুলোয় থাকতাম তার পেছনেই ছিল বিশাল বন। সময়ে অসময়ে কতবার যে হাঁটতে গেছি
সেখানে। দেখেছি বিভিন্ন রকমের গাছেরা কীভাবে মাথা দুলিয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়েছে, শুনেছি
পাখির ডাক। শহরের ভেতরও এমন অরণ্য থাকতে পারে সেটা ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু এটাই বাস্তবতা।
মস্কোর ১০ বছরের পড়াশুনার পাট চুকিয়ে ১৯৯৪ সালে আসি দুবনায় গবেষণা করতে। দুবনা ছোট্ট
একটা শহর। মস্কো থেকে ১২০ কিলোমিটার উত্তরে। এখানেই গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে মস্কো
কানালের মাধ্যমে ভোলগার সাথে মস্কো নদীর সংযোগ করা হয়। তারপরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বিভিন্ন
গবেষণা কেন্দ্র। সে গল্প পরে কোন এক সময় করা যাবে। দুবনার কাছে মস্কো মনে হয় কংক্রিটের
অরণ্য। আমাদের দেশে সাধারণত বাড়িঘরের মাঝে মধ্যে দু একটা গাছ দেখা যায়। দুবনায় ঠিক
উল্টোটা - গাছাপালার ভেতর থেকে মাঝে মধ্যে দু চারটে বাড়ি উঁকি দেয়। এ থেকেই বোঝা যায়
দুবনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চারিদিকে বার্চ পাইনের বন, শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া
ভোলগা নদী আর দু পাশে দুবনা আর সেস্ত্রা নামে আরও দুটো নদী। পাশেই ইভানকভস্কোয়ে রিজারভয়ার
যা মানুষের কাছে মস্কো সাগর নামে পরিচিত। এই দুবনাতেও গাছ কাটলে মানুষ প্রতিবাদ করে।
বছর দুই আগে ভোলগার তীরে যে বনরাজি ছিল সেখানে এক বিরাট পার্ক করা হল। না, কোন বড় গাছ
কাটেনি, তবে সে জায়গা যাতে শুধু বন না হয়ে মানুষের রেস্ট নেবার উপযোগী হয় সে জন্যে
অনেক রাস্তাঘাট, খেলার কোর্ট, বেঞ্চ আর বাচ্চাদের খেলার পার্ক করা হয়েছে মাঝে মধ্যে।
এতে করে কিছু গাছ কাটতে হয়েছে। আর তাতে মানুষের ক্ষোভের সীমা ছিল না। এত গাছ থাকার পরেও যদি কখনও কোন গাছ কাটার উদ্যোগ
নেয় স্থানীয় প্রশাসন, সাথে সাথেই আক্টিভিস্টরা নেমে পড়ে সই সংগ্রহে। এ নিয়ে বাকবিতন্ডা
হয়। এক কথায় গাছের উপর যেকোনো অত্যাচার মানুষ খুব সিরিয়াসলি নেয়।
এই তো কিছুদিন আগে যখন ভোলগায় গেছি সাঁতার কাটতে কয়েকজন মহিলা দেখি কি একটা
পিটিশন লিখছে। আমরা যেখানে সাঁতার কাটি সেটা
শহরের বীচ থেকে দূরে। এখানে সাঁতার কাটা নিষিদ্ধ না হলেও প্রশাসন এটা খুব ভাল ভাবে
নেয় না। যাহোক, সেখানে রাস্তা মেরামত করা হচ্ছে। প্রতি বছর জুলাইয়ের শেষ শনিবার দুবনা
ডে পালন করা হয় আর এটাকে সামনে রেখে শহরে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্ম যেমন গাছ লাগানো,
পার্ক সাজানো, রাস্তাঘাট মেরামত করা – এসব হয়। এই উপলক্ষ্যে এবার আমাদের রাস্তার দিকে
প্রশাসনের সুনজর পড়ল। কিন্তু সমস্যা হল, শোনা গেল, তারা এখানে কতগুলো গাছ কেটে একটা
রোলার স্কেটিং করার পার্ক তৈরি করবে। তরুনদের জন্যে এরকম পার্ক নিঃসন্দেহে দরকার, তাই
বলে গাছা কাটা? সাথে সাথেই পিটিশন লিখে পাঠানো হল আমাদের ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর, শহরের
মেয়র, মস্কো রেজিয়নের গভর্নর আর প্রসেকিউটরের কাছে। গাছ কাটা আপাতত বন্ধ। আশা করি সেটা
চিরতরেই বন্ধ থাকবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এর সাথে চট্টগ্রামের সম্পর্ক কী? বিজ্ঞানমনস্কতাই বা এখানে কী করবে?
আমরা এর আগে বলেছি যে বিজ্ঞান যখন প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায় সেটাকে বিজ্ঞান না বলে অপবিজ্ঞান
বলাই ভাল। মানুষ প্রকৃতির অংশ। বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কাজ হল প্রকৃতিকে জানা, কীভাবে
তার বিবর্তন ঘটে সেটা বোঝা, প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটন করে প্রকৃতির শক্তিকে মানবজাতির
কাজে লাগানোর উপায় বের করা।
এক সময় ধারণা করা হত যে গাছের প্রাণ নেই, সে যাকে বলে জড় বস্তু। কিন্তু আমাদের দেশেরই
প্রথিতযশা বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণ করেন। তিনি দেখান যে অন্যান্য প্রানীদের
মত গাছেরও প্রাণ আছে। মানুষের মত গাছেরও অনুভূতি
আছে। মানুষ তো বটেই যেকোনো প্রাণীর অস্তিত্বের জন্য গাছের ভূমিকা অপরিসীম। গাছ শুধু
আমাদের খাদ্য, জ্বালানি, আসাবাবপত্র, ঘরবাড়ি তৈরির উপাদান, তীব্র রোদে শীতল ছায়াই দেয়
না, সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেনও সরবরাহ করে। তাই জল আর বাতাসের মত গাছের উপস্থিতিও
আমাদের জীবনে অপরিহার্য। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গাছের উপস্থিতি অনস্বীকার্য।
তাই নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই মানুষকে হতে হবে গাছের প্রতি সংবেদনশীল, হতে হবে প্রকৃতি
প্রেমী। আজ মানব জাতির সম্মুখে যেসব চ্যালেঞ্জ আছে তাদের মধ্যে অন্যতম পরিবেশ দূষণ।
আর এই ব্যধি থেকে পৃথিবীকে রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায় বৃক্ষরোপণ। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে
প্রকৃতি প্রেমী হিসেবে গড়ে তোলা, তাকে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গাছের গুরুত্বের কথা
অনুধাবন করতে শেখানোই বিজ্ঞানমনস্কতা। তাই
সিআরবি রক্ষা, বৃক্ষরোপণ এসবের পাশাপাশি আমরা যদি আমাদের সিলেবাসে পরিবেশ সংরক্ষণ সহ সেসব বিষয় যা ছোটবেলা থেকেই মানুষকে প্রকৃতি প্রেমী করে তোলে অন্তর্ভুক্ত করার
দাবী না তুলি সেটা সব সময়ই ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন হবে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেবে না। তাই সিআরবির কথা
বলতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই বিজ্ঞানমনস্কতার কথা আসবে। মানুষ বা অন্য কোন প্রানীর মৃত্যুতে
আমরা যেমন ব্যথিত হই, যতদিন না মানুষ গাছ কাটলেও সমপরিমাণ ব্যথিত হবে ততদিন দেশে বার
বার উদ্যান কাটা হবে। আর মানুষ যাতে গাছের জন্যও ব্যথিত হয়, গাছ রক্ষায় সোচ্চার হয়
সে জন্যে তাদের অবশ্যই বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে।
একটা সময় ছিল যখন ধারণা করা হত যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। মানুষ যেহেতু নিজেকে সৃষ্টির সেরা জীব বলে ভাবত, তাই পৃথিবীই যে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। পরে সে জানল পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। এতে তার সম্মানে আঘাত লাগল বটে, তবে সেটা তাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসন থেকে নামাতে পারল না। আজ আধুনিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের কোন কেন্দ্র নেই, এর প্রতিটি বিন্দুই সমান। মহাবিশ্বেরই যদি কেন্দ্র না থাকবে প্রাণী জগতের কেন্দ্র কেন থাকবে? তাই প্রাণী জগতে কেউই সেরা নয়, সবাই সমান। মানুষ যদি সৃষ্টির সেরা জীবই হত তাকে আজ করোনার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কাল কাটাতে হত না। এক ধরণের গাছ সুস্বাদু ফল দেয় অন্য গাছ দেয় কাঠ, কিছু প্রাণী জলে থাকে কিছু থাকে ডাঙ্গায়। প্রতিটি জীবই কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যকে ছাড়িয়ে যায়। তাই এখানে কে বড় আর কে ছোট সেটা নিয়ে বিতর্ক বোকামি। ফুটবল আর ক্রিকেটের মাঠে ম্যারাডোনা আর তেন্ডুল্কার যেমন সফল, মাঠ বদলে দিলে দু’ জনেই একই পরিমাণ ব্যর্থ।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষের জীবনে হাসপাতালও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটা কি গাছ বা উদ্যানের বিকল্প? মোটেই নয়। হাসপাতাল যেখানে রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে, সেখানে উদ্যান পরিবেশ দূষণ রোধ করে রোগ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করে। সেদিক থেকে উভয়েই মানুষের স্বাস্থ্যের পরিচর্যা করে। কিন্তু গাছ শুধু মানুষের দেহেরই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের সেবাও দেয়। তাই হাসপাতাল উদ্যানের বিকল্প নয়, পরিপূরক। জাতির স্বাস্থ্যের জন্যই তাই উদ্যান রেখেই হাসপাতাল গড়তে হবে, শুধু তাই নয়, সাথে সাথে উদ্যানকেও পুষ্ট করতে হবে, মানে আরও আরও গাছ লাগাতে হবে। হয়তো সেদিন বাংলাদেশে বেড়াতে এসে প্লেন থেকে নীচে তাকিয়ে মানুষ দেখবে সীমাহীন সবুজের সমারোহ ঠিক যেমনটা আমাদের লাল সবুজ পতাকায়।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি প্রগতির যাত্রীতে ০৬ আগস্ট ২০২১ প্রকাশিত হয়েছে
https://www.progotirjatree.com/2021/08/06/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be-3/?fbclid=IwAR0AcJmwhMnynK_NlRq0PMf2_PVwu-sAvbWOyjdkHhwYWtV2JZ7SMj3SVCI



Comments
Post a Comment